হেলেন

এই অবিনশ্বর নগরীর হেলেন তুমি!
ইতিহাস হয়ে যাওয়া ট্রয়,
আজ আর তোমার জন্য নয়।

আজিকার মেনিলিউস তোমার জন্য
নিয়ে আসবে না উপহার,
তোমার মেঘজমা চুলের আকাশে
মুগ্ধতা নিয়ে উড়ে বেড়াবে না আর।
তোমার জন্য নিযুক্ত করবে না
আশিজন প্রহরী আর সেবাদাসী,
ফিরেও তাকাবে না মহলের যে কোনে
নেমেছে আঁধার খুব উদাসী।
প্রেমের জন্য উন্মাদনা ইতিহাসে আছে
এখন উন্মাদনায় প্রেম হয়,
আজিকার হেলেন, ইতিহাস তোমার জন্য নয়।

আজিকার প্যারিস যথাযথ ভীষণ
এক পরিণত বাণিজ্যদূত,
তোমার প্রেমান্ধতায় সে আচ্ছন্ন নয়
তোমার নেশায় থাকে না বুঁদ।
স্পার্টার রাত্রিতে হিসেবী প্যারিস
তোমায় কখনই খুঁজবে না,
ফেরার পথে সমস্ত চোখের অন্তরালে
জলযানে লুকিয়ে রাখবে না।
লাইব্রেরির বন্ধঘরে ইতিহাস কয়েদী
সাংঘাতিক প্রেম কেবলি মোহময়,
আজিকার হেলেন, ইতিহাস তোমার জন্য নয়।

এজিয়ান সমুদ্রগর্ভে ডুবে গেছে অতীত
স্পার্টা থেকে ট্রয়, ট্রোজানের ঘোড়া,
এই নগরে থেমে গেছে প্রেমের যুদ্ধকাল
কালের উত্তাপে অনুরাগ সব পোড়া।
যেদিন পুড়েছে ট্রয় দাউদাউ প্রেমের তৃষায়
সেদিন বুঝেছে নগর প্রেমদাহ,
কেউ তো জানেনি আজও তুমি হলে কার!
কোনদিকে গেছে তোমার প্রেমের প্রবাহ।
ইতিহাস শুনেছে ট্রোজানের দামামা
দেখেছে রক্তে আঁকা ট্রয়,
আজিকার হেলেন, ইতিহাস তোমার জন্য নয়।

 

রিংমাস্টার

খাঁচার বাঘিনী বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে
তুমি কোথায় হে রিংমাস্টার?
কোথায় ছিলে রাত-ভোর? ভাটিখানায়?
সেয়ানা নটীর সুগন্ধবহ রাঙা দেহ
আর রঙিন জলের মাখামাখি তে প্রচ্ছন্ন ছিলে কি?
নাকি জুয়ার টেবিলে দানের পর দান হেরে
কলকির বাষ্পরথে মিথ্যের বৃন্দাবন দাপালে?
তুমি কি অর্পণ করেছো তোমার কারদানি
অথবা খেলার ছড়ি কোন অসার অনাবশ্যকের তলাহীন টুকরিতে?
নাকি নিরক্ষ মাঠের চাতালে শুয়ে
ব্যর্থতার গল্প শোনাচ্ছো রাতপ্রহরীকে?

তোমার খাঁচার বাঘিনী ক্ষুধাতুরা রাতভর।
তুমি খোরাক দাওনি হে রিংমাস্টার!
সমস্তরাত বিকট শব্দে দাহাড় করে
খাঁচার দেয়ালে দেয়ালে ব্যর্থ আঁচড়ে
বাঘিনী তার অক্ষমতার জানান দিয়েছে।
প্রতিবেশ আতংকিত রেখে
অতঃপর গুটিয়ে পড়েছে নিস্তেজ দেহে তোমার খাঁচাতেই।
দেরি নয় আর দেরি নয়, আলো জ্বলে গেছে,
সূত্রধরের ঘোষণাপাঠ শুনেছে সবাই,
দর্শকের করতালিতে গুঞ্জিত সমস্ত সার্কাস প্যান্ডেল!
কোথায় তুমি হে রিংমাস্টার?
গ্রীনরুমের মেকাপে লুকাও ব্যর্থতার দাগ,
জমকালো পোশাকে মঞ্চে এসে দাড়াও,
ক্ষিপ্ত বাঘিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে তবে,
তোমার খেলা যে তোমাকেই খেলতে হবে!

 

অপারগতা

সময়, দূরত্ব, শেকড়বাকড় জরাজীর্ণ অস্তিত্বের জড়তায়,
এতসব হিসেব নিকেশ পাড়ি দেবার যত অক্ষমতায়,
তুমি-আমি অতঃপর,
দুইদিকে দুইপথ, অথচ থেমে থাকি মৃত চৌরাস্তার উপর।
বিদায় তিথিডোর,
যে চোখ ভিজেছে পশলায়, যে বুক দিয়েছে আদর,
সেখানে জমেছে অটল বাটালি হিল,
চেনা আঙ্গুল হয়েছে দাবানল, বুক বিষে ধরেছে নীল।
বিহঙ্গের চলাচলে,
যে ডানা যেতো মেলে,
যে দুয়ার উন্মুক্ত তখন নিশিগন্ধা প্রদীপ জ্বেলে,
যে মনে অভিলাষ “এই বুঝি তুমি এলে”!

সময়, দূরত্ব, শেকড়বাকড় জরাজীর্ণ অস্তিত্বের জড়তায়,
দুয়ারে লেগে যায় কপাট, ডানা ভাঙা বিহঙ্গ মরে যায়,
তুমি-আমি অতঃপর,
ডেজার্ট চামচে লুকাই ক্ষুধা আর পিপাসার বালুচর।
আজ সব দৌড় একমুখী রাস্তায় দ্বিধাহীন,
খুলে দেখা এলবাম কদাচিৎ, সমীচীন!
আয়নায় এলোকেশী,
সাজঘর পেতে মুখশ্রী রাঙ্গায় নিজ ভূমে পরদেশী।
ক্ষয়ে যায় যত রোমন্থনের রত্নাচল,
অবিচল,
তার অধিক ক্ষয়ে যায় স্বপ্ন, তার অধিক জমে থাকে দায়,
জীবনের লাগাম ধরে নাগপাশ ছুটে চলে নিস্তেজ অচেনায়।

সময়, দূরত্ব, শেকড়বাকড় জরাজীর্ণ অস্তিত্বের জড়তায়,
ব্যস্ততম রাস্তা তুমি সম্পর্কের নাগরিকতায়,
তুমি-আমি অতঃপর,
বুকের আর্কাইভে জমে গেছে বিকলাঙ্গ কয়েকশ বছর।

 

ছোঁবার পর বুড়ো হয়ে যেও

আজকাল তোমার নাকি জগতের ঘুম!
সমস্তরাত এপাশ ওপাশ নিংড়িয়ে
জানালার গ্রিল ধরে নাগরিকী স্তব্ধতায় দেখো!
অদূরবর্তী অচিন আগন্তুকের কালো আলখাল্লার আঁধারে
নিজেকে লুকিয়ে একটু জেগে থাকো!
চায়ের কাপে ধোঁয়ার ধনুকে পরবশ হয়ে,
মানিকের বইয়ে, সঞ্জীবের গানে
নির্ঘুম পিকাসো চোখের পলকে রাঙ্গিয়ে আরেকটু জাগো!
আমার মুঠোয় অজস্র নিদ্রাবতীরা থাকে,
আঙ্গুলে বিছানো স্বপ্নজড়িমা স্বর্ণ-মাদুর,
শিয়রে এলে বন্ধ কর চোখের দরোজা,
আমি হাত বুলিয়ে দেবার পর নাহয় ঘুমিয়ে যেও।

আজকাল নিজেকে নাকি অযত্নে রাখো!
প্রভাতসূর্যকে আলিঙ্গন করে
দক্ষিণা মৃদুজল আঁজলায় ভরে শরীর ভেজাও!
ঘাসের ক্যানভাসে মহামহিম চিত্রকরের চেতনায়
দুপুরের অলস তুলির রাঙা আঁচড় হয়ে বাঁচো।
বিকেলের সোনারোদে আচলে কুয়াশা ভরে
নূপুরের শব্দে ভেঙে দাও লজ্জার প্রতিবিম্ব।
ফিরে এসো সন্ধ্যার উঠানে, জোছনা পোহাবার আমন্ত্রনে!
কামনার সুগন্ধি মেখে রাত্রির বিছানায়
গোখুরার মতন অপেক্ষায় থেকো।
আমার বুকে সহস্র যুগের অভিলাষ,
নিঃশ্বাসে রাখা ভিসুভিয়াসের উত্তাপ!
বাহুডোরে এসে অযত্নে হারিয়ে যেও,
আমি ছুঁয়ে দেবার পরেই নাহয় বুড়ো হয়ে যেও!

 

অন্ধ বীরাচার

এ কেমন অগ্নিশপথ হে যোদ্ধা?
কুরুক্ষেত্র গড়বে বলে ভেঙ্গে দিলে নিবাস।
রমণীর আঁচলে সাদা শকুন বিছিয়ে
তার ওপর রচিলে রতিবিদ্যার ইতিহাস!

তারপর তোমায়,
বীরভূম বুকে গুঁজে নেবে পর রক্তমালায়,
ছায়াপিঠ খুঁজে পাবে কি সেইখানে?
যাত্রাপথ ডুবে গেলে অন্ধকূপ অনন্তশালায়!

নিষ্পাপ কস্তূরী,
ধনুকের নিশানায় করেছো বধ, কতবার!
অরণ্যের শীর্ষে শীর্ষে রোদের খেলা দেখে
এবার পোড়াতে এসেছো সবুজের সম্ভার।

যোদ্ধা তুমি,
বিকলঙ্গ হয়ে গেছো রাজরাজেশ্বরের পায়ে,
সময় যেদিন ফুরাবে হে দৃষ্টি-নক্তচর
যবনিকা ছেপে যাবে তোমার বীর অধ্যায়ে।

লিখে নাও অক্ষরে,
তোমায় ভুলে যাবে প্রাণী; ভুলে যাবে ঈশ্বর,
রাত পোহাবার স্তোত্র বাজে শোনো ঐ
রণভঙ্গে গির্জা ভেঙো, ভেঙো না নিজের ঘর।

 

Error: View 0e2b7795t8 may not exist

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *