দ্বীপ
যতোবার দুয়ার খুলি তোমার সাথে দেখা
তবু কেউ আমার নেই দিনমান আমি একা

ভীড়ের মধ্যে একলা হয়ে
হারতে হারতে হারিয়ে গিয়ে
দেখি আরশিতে টিকটিকি টিক-টিক-টিক
একা ঘর, একাই বসতি। মানুষ সর্বভূক জীব

চেটে-পুটে প্রেম খায়
সেতু সব ভেঙে যায়
দোপায়া সুপ্ত সরীসৃপ
কোথাও মানুষ নেই
পৃথিবী জুড়ে সাতশো কোটি দ্বীপ

 

যাত্রা
ঘর থেকে বের হলে দরজা ফিরে চাই
ইতিকথার পরের কথা বিদায়, এবার যাই
উত্তর আসে না পথ হাঁটি ছোট পায়
বোকা দরজা চাবির সাথে কথা কয়

হঠাৎ পেছনে চেয়ে নিজের সাথেই হাসি
না, কেউ আমাকে বলে না
‘যাই না, বলো আসি’

 

ভিসা
নবাব আলী যাবে ইউরোপ, টিয়া-রঙা পাসপোর্ট,
কেডস-সানগ্লাস, আয়না চকচক, ঢাকা এয়ারপোর্ট।
ওমান বন্দর, তেলভরা শিপ, নবাব আলী কই?
‘ট্যাংকির নিচে চুপ করে থাক’ ‘ওকে, তাই সই’।
‘নিতে হবে দম, কম কম অক্সিজেন কম আছে’
তবু গুডলাক, নবাব আলী লিবিয়ায় এসে গেছে।

ফোন ক্রিং ক্রিং, আটক নবাব আলী লিবিয়ায়
টাকা আরও টাকা দাও, নবাব আলী বাঁচতে চায়
গয়না টাকা, জমি টাকা, লিবিয়ায় যায় উড়ে
যায় যাক, সব যাক শুধু নবাব ফিরুক ঘরে।

উপরে আকাশ, নিচে ব্লাক সি সাগরের নাম ‘কালো’
ছোট্ট নৌকা? নো প্রোবলেম ইঞ্জিনের দম ভালো।
শুধু কালো সাগরটা পার হতে হবে, আর বেশি দেরী নাই
কিন্তু এতো শীত? ক্ষয়ে যায় হাড়, বাতাসে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ছাই
ভুইলা থাক, নবাব, মনে কর সখিনার ঠোঁটে গরম ধুঁয়া ওড়ে
আর মাত্র দুইটা দিন, সহ্য কর, ঐ যে ইউরোপ, ওই পারে

ঠাণ্ডা সাগরে দুই দিন? বহুত লম্বা, কাটে নাই সেই দিন
নৌকার কোনে পড়ে আছে দেহ নামহীন, প্রাণহীন।
সাগর ভরা তারা নিয়ে ব্লাক সিতে ভাসছে আকাশ
ইউরোপের মাটি ছুঁলো নবাব আলীর স্বপ্নভরা লাশ।

শেষ বিকেল, আবছা আলো নবাব আলীর মা
পোলার কি দোষ? অর নাকি ভিসা ছিলো না।
শীতের উঠানে অতিথি পাখি, ভীনদেশী স্বরে ডাকে
ঘোরে দেশে-বৈদেশে ‘পক্ষিগুলারে ভিসা দেয় কে?’

 

লবণ চাষী
‘পড়ছি কেন? চাকরি চাই রিসার্চ ফিসার্চ বুঝি না
সাগর এলে পায়ের কাছে, নামব সবাই লবণ চাষে
মুক্তা-টুক্তা খুঁজি না’

মা মা গন্ধ মাখা ভাত
আলো ফুটেছে বাংলাদেশে, ইউরোপজুড়ে এখনও গহীন রাত
এখানেও শুকতারা ওঠে, কিন্তু বাংলা জানে না, বলে না সুপ্রভাত
মনের ক্ষিধা নিয়ে রাত জেগে আছে, টেবিলে পিৎজা ফিসচাপ
ঘুমাতে চাই দাও না আমায় একমুঠো মা মা গন্ধ মাখা ভাত

 

ওড়া
একলা তুমি? কেউ পাশে নেই? আজো তোমার কান্না থামেনি?
তাকিয়ে দেখো
শুধু তোমায় নিয়ে উড়বো বলে, আজো আমি ওড়া শিখিনি

 

শীতবৃষ্টি
সন্ধ্যা হতে কাঁদছে আকাশ, রিনরিন
স্মৃতিরা ভিজছে তোমাকে নিয়ে
ইউরোপ বড়ো ম্লেচ্ছ, ঋতুজ্ঞানহীন
শীত আসে ছাতা মাথায় দিয়ে

শীতবৃষ্টি, শীতবৃষ্টি, পাহাড় কাঁপাকাঁপি
ব্যালকনিতে পাখিদের জল-চুমো
একলা ঘরে হিটারের জ্বর মাপি
মিস করছি তোমার গায়ের ওমও

বিজন ট্রেনে কয়েকজোড়া ভিজে ভালোবাসা
ঠাণ্ডা আলোয় ঠোঁট সেতুতে উঠেছে ধোঁয়াশা
ওদের জন্যই শীতের বৃষ্টি। জলও নিরব প্রেমি
ঠোঁটের আগুনে প্রেমের যজ্ঞ। জ্বলছি নাকি আমি?

তুমিও রয়েছ বাংলাদেশে, ভাদ্র মাসের ভাপে
জানলে না তো, বৃষ্টি হয়ে ঝরছো ইউরোপে

 

বাংলাদেশ
জর্জ হ্যারিসন
অনুবাদ: সুজন দেবনাথ

জলভরা চোখে বন্ধুটি এলো
ওর দেশটা যে আজ বড়ো এলোমেলো
ওদের পাশে দাঁড়াতে হবে
সব নিঃশেষ হবার আগে

ওদের ব্যথা বুঝতে পারিনি, তবু বন্ধু নিশ্চয়ই জানি
একটা কিছু করতে যে চাই
পেতেছি যে হাত তোর কাছে তাই
চলো, ক’টা জীবন বাঁচাই

বাংলাদেশ বাংলাদেশ লক্ষ মানুষ নিমেষে শেষ
সব এলোমেলো চারিদিকে দুখ
কখনও দেখিনি এতো জলভরা চোখ
বন্ধু আমার, দু’হাত বাড়াও
কষ্টটা বুঝে পাশেতে দাঁড়াও
বাঁচাও মানুষ, বাঁচাও দেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বাংলাদেশ অবোধ্য ব্যথা অনিঃশেষ
সব এলোমেলো সবখানে দুখ
কখনও দেখিনি এতো জলভরা চোখ
বন্ধু তুমি সরে যেও না, কাছেকাছে রও
কানের সমুখে মুখখানি লও
বাঁচাও মানুষ, বাঁচাও দেশ
বাঁচাও প্রাণের বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বাংলাদেশ সেই সুদূরের অচিন দেশ
তবু চোখটা তোমার দেখতে যে পায়
আমার কানও ব্যথা শুনে যায়
নিরন্ন শিশু, দুটো মোটা ভাত
চলো তুলে দেই, হাতে রাখি হাত
এসো মুক্ত করি একটা দেশ
বাঁচাও মানুষ, বাঁচাও দেশ
মুক্ত করি বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ

বন্ধু আমার, দু’হাত বাড়াও
বেদনাটা বুঝে পাশেতে দাঁড়াও
বাঁচাও মানুষ, বাঁচাও দেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ

‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ -এ গাওয়া জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’ গানটির বাংলা অনুবাদ

 

Error: View 0e2b7795t8 may not exist

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *