শরৎ
হেমন্ত
শীত
বসন্ত
গ্রীষ্ম
বর্ষা
শরৎ


শরৎ মানে

শরৎ মানে প্রকৃতিতে
অপরূপ এক সাজ,
গাছ-পালা আর লতায়পাতায়
সবুজ কারুকাজ।

শরৎ মানে নদীর দুপার
সাদা কাশের চর,
হিজল গাছে হলদে পাখির
হলুদ বরণ ঘর।

শরৎ মানে মাঝির কণ্ঠে
জারি-সারি গান,
মাঠে মাঠে সোনার ধারে
ব্যাকুল চাষীর প্রাণ।

শরৎ মানে রাতের তারা
বাঁকা নায়ের চাঁদ,
পুকুর পাড়ে ঝোপে-ঝাড়ে
জোনাক পোকার ফাঁদ।

শরৎ মানে ফুলে ফুলে
প্রজাপতির মেলা,
দিঘির জলে ভাসছে যেনো
সাদা বকের ভেলা।

শরৎ মানে ঝিঁঝিঁ পোকার
দারুণ ডাকাডাকি
শিশির ঝরে পাতার ঠোঁটে
রোদের মাখামাখি।

 

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন


শরৎ

শরৎ কি আর শিউলি ফোটায়
বোঁটায় বোঁটায়?
জোটায় কি সে ভ্রমর, প্রজাপতি?
শরৎ এখন কেমন করে আসে ও যায়
বুঝি না তার কোন মতিগতি।

শরৎ কি আর হয় বিহ্বল
হয় চঞ্চল
মুগ্ধ-ব্যাকুল পাখির গানে গানে?
শরৎ এখন বর্ষা হয়ে অঝোর ধারায়
মেঘের মতো কাঁদছে অভিমানে।

শরৎ কি আর করছে আদর
পরিয়ে চাদর
নতুন ভাদর কি নতুন আশ্বিন?
শরৎ এখন কাল ভুলে তার জানিয়ে যায়
অতীত দিনের ভালবাসার ঋণ।

শরৎকে তাই যতই বলি
কাশফুল আর ঘাসফুলে তুই
থাক জড়িয়ে থাক না-
শরৎ কেবল দূর আকাশে
দেয় মেলে তার পাখনা।

 

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন


হে শরৎ

হে শরৎ
তুমি মাঝে মাঝে ভিজাও
এক পশলা বৃষ্টিতে আমায়,
বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা কাশফুলের ছোঁয়া
লাগে আমার জামায়।

হে শরৎ
তোমার আকাশে তুলো বর্ণের মেঘ
ভেসে বেড়ায় আমার স্বপ্ন ধরে
তোমার সাথে সজীব বৃক্ষ দেখে
মন আমার খুশিতে যায় ভরে।

হে শরৎ
ষড়ঋতুর এ দেশে তুমি আসো
এত রোদ-ঝড়-বাদল উপেক্ষা করে
মনে হয় যেন সব ঋতু তোমায়
পথ করে দিতে যায় সরে।

হে শরৎ
তোমায় নিয়ে এত ছড়া-গান-কবিতা
যার পাই না খুঁজে কোনো অন্ত
তবুও তুমি কেন এত মধুর
তোমার ব্যপ্তি চিরকাল অনন্ত।

 

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন


শরতের জন্য ভালোবাসা

হারিয়ে গেছে বৃষ্টি এখন বৃষ্টি কি আর নামে
শরৎ জাগায় রূপের সাড়া বাংলাদেশের গ্রামে
গ্রাম হয়ে যায় রূপের আড়ঙ গ্রাম হয়ে যায় ছবি
আমার মনের রঙতুলিতে রঞ্জিত তাই সবই।
সাতসকালে সূর্য দেখি চোখ জুড়ানো হাসে
সেই হাসি তার ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত উচ্ছ্বাসে।
খোশ মেজাজে রঙিন সাজে সাজায় আলোর জরি
সবুজ পাতার বন হয়ে যায় অপূর্ব সুন্দরী।
গ্রামের মাঠে ঘাসের ঠোঁটে চুম দিয়ে যায় রোদ
মনের ভেতর কাঁপন জাগায় অপূর্ব এক বোধ
জুড়োয় এমন আলোর নাচন জাম জারুলের গাছে
শিউলি ফুলের গন্ধ এসে বেড়ায় বাড়ির কা।ে
দূর্বাঘাসের রঙ দেখি সেই ফড়িংগুলোর ডানায়
ঝিঙেলতায় ফিঙে নাচে যেমন করে মানায়
শান্ত ছায়া বাড়ায় মায়া গন্ধ বিলোয় যুথী
শরৎরঙের পরত খুলে ছড়ায় আলোর দ্যুতি।
আকাশটাকে দেখায় দারুণ সূর্যদীঘল বাড়ি
বাড়ির ছাদে যেন বা কেউ শুকোয় মেঘের শাড়ি
ফকফকে সেই শাড়ির গায়ে শাদা রঙের ছোপ
বৃষ্টিধোয়া হয়তো বা তাই দেখান এমন ধোপ।
নদীর জলে সুর তোলে ঢেউ মল্লা-মাঝির গানে
পালতোলা সেই নৌকোগুলো বাতাস ধরে টানে
কাশের বনে ফুলপরীরা ছড়িয়ে তাদের ডানা
হাতছানিতে হয়তো আমায় যায় ডেকে একটানা।
উছল বালক তাইতো আমি সেই ডকে দেই সাড়া
আমার তো আর নেই যে কোনো বাড়ির কাজের তাড়া
প্রায় সারাদিন মাতিয়ে রাখি আমি কী আর বোবা
চোখের পাতায় সাজিয়ে রাখি শরৎরানীর শোভা।

 

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন


শরতে

সাদা মেঘ উড়ে যায়
ছড়া গান জুড়ে যায়
ছোট ছোট শিশু আর বড়তে
শরতে।

বনে পাতা ঝরে যায়
পাখি গান করে যায়
ছবি এঁকে এ-মনের পরতে
শরতে।

মাঝি নাও বেয়ে যায়
ভাটিয়ালি গেয়ে যায়
দোল লাগে জৈব ও জড়তে
শরতে।

কাশে বায়ু দুলে যায়
বক ডানা তুলে যায়
কাকলিতে মাতে টিয়া-ভরতে
শরতে।

 

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন


শরৎ আসে, শরৎ হাসে

শরৎ আসে দূর্বা ঘাসে শিশির হাসে ‘ফিক’
রোদের সোনা যায় না গোনা ঝরলো চারি দিক!
খুশির গাড়ি দিচ্ছে পাড়ি কু-ঝিক্-ঝিক্ ঝিক্
দূর্গা মায়ের আশিষ সবাই ভাগ করে আজ নিক্!

শরৎ আসে ধীর বাতাসে শিউলে ঝরে ‘ঝুর’
নীল আকাশে স্বপ্ন ভাসে গন্ধেতে ভর পুর!
নদীর পাশে কাশের রাশে কী উল্লাসের সুর!
বুকের মাঝে বাজনা বাজে ঢ্যাম কুড়া কুড় কুড়!

শরৎ আসে চতুর্পাশে শুনছি কিসের ডাক
চিত্ত-চাতাল নিত্য নাচে হৃদয় হত বাক্!
মত্ত-মাতাল উথাল পাথাল তাক ধিনা ধিন তাক্
প্রাণের পাতায় খুশির খাতায় মনকে মাতায় ঢাক।।

শরৎ আসে কী উচ্ছ্বাসে কাঁপছে নদীর জল
পাখনা মেলে বেড়ায় খেলে পের্জাপতির দল!
বাজলো কাঁসর সাজলো আসর চলরে সবাই চল্
মন-গালিচায় বন বাগিচায় নামবে খুশির ঢল!!

শরৎ আসে কী বিশ্বাসে আনবে সুখের রেশ
দেখবো কবে এমন হবে হাসছে সবাই বেশ!
গরীব দুখী সবচে সুখী দুঃখ কষ্ট শেষ
কান্না ভুলে দু’হাত তুলে নাচবে সারা দেশ!!

 

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন


এই শরতে নতুন পুঁথি

আবার শরৎ এলো, ভোরের দোয়েলের মতন শিষ দিতে দিতে; অথচ তাজমহল ভেঙে পড়বার দৃশ্য একে একে ভেসে উঠছে হৃদয়ে- বিষদষ্ট জলাশয়ে ভেসে ওঠা মাছের ধরনে। মানুষের পায়ের আঘাত তীব্র হয় জানি; হাতেরও। আঙুলে পাহাড় ধরেছেন কোনো কোনো পৌরাণিক বীর। কিন্তু তোমার পা-গুলো পদ্মের কোরক; হাতগুলো মোমের প্রদীপ- আলতো ছোঁয়াতেই গলে গলে পড়ে…

কোনো কোনো চরিত্র, কেউ কেউ দেবী বলেই জানে, অথচ বিষ ঝরে চোখে; কোনো কোনো দেবতার দৃষ্টিতে আমের মুকুলের মতো ঝরে পড়ে মাথা! কিন্তু তোমার চোখদুটো নরম মার্বেল পাথর, কখনওবা টলমলে জল; মায়ার সায়র।
কারো কারো ঠোঁটজোড়া ইটের টুকরো, কেউ কেউ বিষধর কীট; তোমার তো প্রজাপতি, উড্ডীন কমলার কোয়া; অপরূপ মোহ।
কথা নয়, কোনো কোনো মুখ থেকে ঝরে পড়ে আঁধার; কেউ কেউ তপ্ত দুর্বাসা, মুখ খুললেই লাভা, যেন জ¦লন্ত ফুজিয়ামা। তুমি তো অমরালোকের পাখি, কথাগুলো লতার কণ্ঠে গান।

তবুও তাজমহলটা ঝরে গ্যালো, ভূমিকম্পে যেমন উঁইয়ের ঢিবির মতো ঝরে পড়ে শহরের শিরদাঁড়া। সবকিছু ঝরে পড়ে, কীসের আঘাতে যে, আজও তা পেলো না খুঁজে প্রত্নতত্ত্ব মন। মহলশূন্য কেটে যায় রাজকীয় ফকির জীবন।


সাম্যর স্ট্যাটাস

সীমান্তের কাছে বসে আজও স্ট্যাটাস দেয় সাম্য, আর আমি তার মুখে দেখি আপন-আদল; যত দেখি সাকুরা-সুরার মতো ততই ডুবে যাই আপনেই।
অন্যদিনের মতন সেদিনও আড্ডায় মুখর ছিল আজিজ-চত্বর। শাহবাগ-মোড় থেকে কাঁটাবন- জোনাকির রূপ ধরে কিলবিল করছিল অন্যপোকারা। সেদিনও সংসার-তাড়া-খাওয়া মানুষের তাড়া ছিল; তাড়া ছিল আমাদেরও- কখন জুটবে সবাই?
শরৎ-মেঘের মতো অবসর হাতে সেই সুবর্ণ সন্ধ্যায় অশোকের সাথে অজস্ত্র বইয়ের সুগন্ধে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অদূরে বিজয় রুদ্র সুজন মামুন তানজিমসহ শূন্য-র কবিরা- যারা প্রতিদিন প্রতিশ্রুতির স্বাক্ষর রাখছে, ছোট-ছোট-কাগজে আঁকছে বড় হওয়ার স্বপ্ন।

হৃদয়ে হলুদ ডাকটিকেট নিয়ে তখনও মাসুদ অফিসে, পরদিনের ফিচার-পাতাটা প্রেসে ধরিয়ে তবেই রিকশায় উঠবে, সাতমসজিদ রোড ধরে ছুটবে এই অভিমুখে। ধূলি ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন আজিজ চত্বর, তবু আমাদের দুজনের আঙুলের ফাঁকে তার জন্যে অপেক্ষমান সিগারেট।

সংলগ্ন ফুটপাতের ব্যস্ত পথচারীদের ভিড়ে এক অব্যস্ত বিনয়ী ও ভয়াবহ ভদ্রলোক ধূলি-ধোঁয়ামেঘ ভেদ করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে জানায়, আমি আপন মাহমুদ, চট্টগ্রাম থেকে এসেছি। ওখানকার তরুণ কবিরা আপনাদের কথা বলেছেন…; সারাদিন শাহবাগ ঘুরেও আজিজ মার্কেট পাইনি। গণগ্রন্থাগার-সিঁড়িতে বসে কত কী ভেবেছি, টুকেও রেখেছি তার কিছু কিছু মলিন কাগজে। এই ঝোলাব্যাগ আর গোল্ডলিফ ছাড়া এ-শহরে কেউ আমাকে চেনে না, আমিও চিনি না। শুধু কজন কবিকে জানি, যাদের নিকট আমি পৌঁছুতে চাই…

কবিতার পাশাপাশি আরো এক মানবিক জেদ কাজ করেছিল মনে। সেদিনই আপন করে নিয়েছিলাম- নিয়েছিলাম তার সমূহ দায়িত্ব। এমন ছন্নছাড়া ভবঘুরে কত যে বেকার এসেছে আমাদের কাছে… কবিতার সাঁকো বেয়ে মিলেছে- মিলেছি আমরাও। অনেকেই করে গেছে ভীষণ শত্রুতা- ক্রমাগত চাল চেলে কত যে মেখেছে কুড়ো- চুনকালি বন্ধুতার মুখে! নিন্দুকের ভূমিকা নিয়ে কেউ কেউ করে গেছে কেবল বিষেদগার। তারা খেয়ে-প’রে বেশ আছে… অথচ আপন, যার বিরুদ্ধে কারো কোনো অভিযোগ নেই, ফিরবে না জেনে চলে গেছে সকলের প্রস্থানের আগে।

সাম্যকে আপন ভেবে বসে থাকি কেন? সে-ও কবি- ভেতরে-বাইরে, পূর্বে ও পরে। আপনের মতো সেও সকল শংকা তুড়ি মেড়ে ফুৎকারে বাতাসে উড়িয়ে দেয়, বলে, ‘কবিতাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে’। দীর্ঘশ্বাসে জীবনানন্দ ধার ক’রে বলি, বধু শুয়ে আছে- পাশে শিশুটিও… তবু আমি অঝোরে কাঁদছি- কেউ জানে না… অনর্জালে মুহূর্তে ধরা দেয় দ্বিধাহীন সহজ উত্তর: বোকাপাখি কাঁদতে জানে না, একশব্দ থেকে লাফ দেয় অপর শব্দের দিকে…

সেই লাফালাফিই কি ঘুমোতে দেয় না- জাগাতে-জাগাতে কেবল নিয়ে যায় দীঘল ঘুমের শেষপ্রান্তে?

 


বিষণ্ন বেলার ভাঙাগান

শরতে এই খেতের ফসল কৃষকেরা তুলে নিয়েছে কবে। দেখো সে জমিনে এখন বসার কত ভালো জায়গা। প্রকৃতি হাতে করে দিয়েছে এইসব। হেমন্ত এসে ডিঙ্গুর পেড়ে বেলা পাঠিয়ে আমাদের অজান্তেই ঘটনা ঘটিয়েছে কত। আর অজান্তেই হৃদয়ে মধু-ফোটা প্রেম আসে কখন! আমি কিছু খুঁজতে আসিনি, তবু প্রিয় কিছু দেখা হয়। মনে হয় ছুটে যাই, ছুটতে থাকি, পৌঁছে যাই সেইখানে। দেখো কত সহজে বাসনাগুলো ফের ঘাস হয়ে জন্মায় সোঁদা মাটির ভুঁয়ে। নীল ও বেগুনি ফুলের ঘ্রাণে ভেসে উড়ে বেড়ায় মাছি। কী যেন নিঃসঙ্গতার গান গায়, বিষণ্ন বেলার ভাঙা গান! আমাকে আহ্বান করেছ তোমরাই- ঠিক কাছটিতে, বোসলাম তোমাদেরই ভড়ংহীন পাশে। আমাকে বুঝানোর অর্থের কিছু প্রয়োজন নেই। অর্থবোধ ঝরে যাওয়া ঘনিষ্ঠ সুরের মৃদুছন্দ সুর-স্রোত বয়ে বয়ে যাক।

 


যদি ভালবাসা পাই

যদি ভালোবাসা পাই              আবার শুধরে নেব
জীবনের ভুলগুলি
যদি ভালোবাসা পাই              ব্যাপক দীর্ঘপথে
তুলে নেব ঝোলাঝুলি
যদি ভালোবাসা পাই              শীতের রাতের শেষে
মখমল দিন পাবো
যদি ভালোবাসা পাই              পাহাড় ডিঙাবো আর
সমুদ্র সাঁতরাবো
যদি ভালোবাসা পাই              আমার আকাশ হবে
দ্রুত শরতের নীল
যদি ভালোবাসা পাই              জীবনে আমিও পাব
মধ্য-অন্ত্যমিল।
যদি ভালোবাসা পাই              আবার শুধরে নেব
জীবনের ভুলগুলি
যদি ভালোবাসা পাই              শিল্পদীর্ঘপথে
বয়ে যাবো কাঁথাগুলি…



প্রেমের কবিতাসমূহ

 

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন

হেমন্ত


হেমন্তে এসেছি ফের

মাঠের এ প্রান্তে ঘাসের বারো মাস বিছানা। কালো ভূতের দেহ নিয়ে মরা এক তালগাছ তার দিকে চোখ রাখে। কেন এ অদ্ভুত চত্বরে একাকী চলে আসি নির্ভয়ে। এখানে এক বসন্ত গোধূলিতে তার সাথে কথোপকথনে কেটে গেছে। তখন কমলা ও ধূসর রঙ উদ্ভাসিত সন্ধ্যাকালে যে সন্নিকটে বিনম্র শ্রদ্ধায় প্রকৃতি ও হৃদয়ে জড়িয়ে তাকে পেয়েছিলাম- আনন্দ অধরার শেষ প্রান্ত চুম্বন করে… এই মরে ভূত তালগাছ, তবু তার আত্মা যেন বেঁচে আছে! ও মনে রেখেছে সব। হেমন্তে এসেছি ফের এখানেই। মৃত আত্মা ও, কাঁদতে জানে না, আমি তো জানতাম, কেন যে ভুলে গেছি, জানি না।

 


হেমন্ত, হেমন্ত

লুকোচুরি খেলার জায়গা এক, কিংবা দুজনে গোপনে বসে গল্প করার। ঝোপঝাড়ের নিচে ছায়া, দূরে মলিন দিগন্ত। দিগন্ত নীল, চাষ করা মাটি, ধূসর রঙের দৈর্ঘ্য চলে গেছে নদীর কিনার বা খাড়িতে। বালিতে ঝিকমিক করছে শাদা উজ্জ্বল দুপুর-রোদ। তোমার ছায়াটা ঘুরে বেড়ায় আমার পিছু, তোমার পিছে আমার অদৃশ্য অনুসরণের ছায়া— স্মরণের আকিঞ্চন ও বিরহ মেঘ ধূসর আকাশে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। কথারা আছে আলের বাদামি ঘাসে, স্বর্ণাভ কাশের বনে, ধানের নাড়ার শিশিরে, তোমার আমার এই দেশাত্মবোধের বেলা।

 


দেবতার গ্রাস

গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে
মৈত্র মহাশয় যাবেন সাগরসংগমে
তীর্থস্নান লাগি। সঙ্গীদল গেল জুটি
কত বালবৃদ্ধ নরনারী; নৌকা দুটি
প্রস্তুত হইল ঘাটে।

পূণ্য লোভাতুর
মোক্ষদা কহিল আসি, “হে দাদাঠাকুর,
আমি তব হব সাথি।” বিধবা যুবতী,
দু’খানি করুণ আঁখি মানে না যুকতি,
কেবল মিনতি করে–অনুরোধ তার
এড়ানো কঠিন বড়ো–“স্থান কোথা আর”
মৈত্র কহিলেন তারে। “পায়ে ধরি তব”
বিধবা কহিল কাঁদি, “স্থান করি লব
কোনোমতে এক ধারে।” ভিজে গেল মন,
তবু দ্বিধাভরে তারে শুধালো ব্রাহ্মণ,
“নাবালক ছেলেটির কী করিবে তবে?”
উত্তর করিল নারী, “রাখাল? সে রবে
আপন মাসির কাছে। তার জন্মপরে
বহুদিন ভুগেছিনু সূতিকার জ্বরে,
বাঁচিব ছিল না আশা; অন্নদা তখন
আপন শিশুর সাথে দিয়ে তারে স্তন
মানুষ করেছে যত্নে–সেই হতে ছেলে
মাসির আদরে আছে মার কোল ফেলে।
দুরন্ত মানে না কারে, করিলে শাসন
মাসি আসি অশ্রুজলে ভরিয়া নয়ন
কোলে তারে টেনে লয়। সে থাকিবে সুখে
মার চেয়ে আপনার মাসির বুকে।”

সম্মত হইল বিপ্র। মোক্ষদা সত্বর
প্রস্তুত হইল বাঁধি জিনিস-পত্তর,
প্রণমিয়া গুরুজনে, সখীদলবলে
ভাসাইয়া বিদায়ের শোক-অশ্রুজলে।
ঘাটে আসি দেখে–সেথা আগেভাগে ছুটি
রাখাল বসিয়া আছে তরী-‘পরে উঠি
নিশ্চিন্ত নীরবে। “তুই হেথা কেন ওরে”
মা শুধালো; সে কহিল, “যাইব সাগরে।”
“যাইবি সাগরে! আরে, ওরে দস্যু ছেলে,
নেমে আয়।” পুনরায় দৃঢ় চক্ষু মেলে
সে কহিল দুটি কথা, “যাইব সাগরে।”
যত তার বাহু ধরি টানাটানি করে
রহিল সে তরণী আঁকড়ি। অবশেষে
ব্রাহ্মণ করুণ স্নেহে কহিলেন হেসে,
“থাক্ থাক্ সঙ্গে যাক্।” মা রাগিয়া বলে
“চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে!”
যেমনি সে কথা গেল আপনার কানে
অমনি মায়ের বক্ষ অনুতাপবাণে
বিঁধিয়া কাঁদিয়া উঠে। মুদিয়া নয়ন
“নারায়ণ নারায়ণ” করিল স্মরণ।
পুত্রে নিল কোলে তুলি, তার সর্বদেহে
করুণ কল্যাণহস্ত বুলাইল স্নেহে।
মৈত্র তারে ডাকি ধীরে চুপি চুপি কয়,
“ছি ছি ছি এমন কথা বলিবার নয়।”

রাখাল যাইবে সাথে স্থির হল কথা–
অন্নদা লোকের মুখে শুনি সে বারতা
ছুটে আসি বলে, “বাছা, কোথা যাবি ওরে!”
রাখাল কহিল হাসি, “চলিনু সাগরে,
আবার ফিরিব মাসি!” পাগলের প্রায়
অন্নদা কহিল ডাকি, “ঠাকুরমশায়,
বড়ো যে দুরন্ত ছেলে রাখাল আমার,
কে তাহারে সামালিবে? জন্ম হতে তার
মাসি ছেড়ে বেশিক্ষণ থাকে নি কোথাও–
কোথা এরে নিয়ে যাবে, ফিরে দিয়ে যাও।”
রাখাল কহিল, “মাসি, যাইব সাগরে,
আবার ফিরিব আমি।” বিপ্র স্নেহভরে
কহিলেন, “যতক্ষণ আমি আছি ভাই,
তোমার রাখাল লাগি কোনো ভয় নাই।
এখন শীতের দিন শান্ত নদীনদ,
অনেক যাত্রীর মেলা, পথের বিপদ
কিছু নাই; যাতায়াত মাস দুই কাল,
তোমারে ফিরায়ে দিব তোমার রাখাল।”

শুভক্ষণে দুর্গা স্মরি নৌকা দিল ছাড়ি,
দাঁড়ায়ে রহিল ঘাটে যত কুলনারী
অশ্রুচোখে। হেমন্তের প্রভাতশিশিরে
ছলছল করে গ্রাম চূর্ণীনদীতীরে।

যাত্রীদল ফিরে আসে; সাঙ্গ হল মেলা।
তরণী তীরেতে বাঁধা অপরাহ্ণবেলা
জোয়ারের আশে। কৌতূহল অবসান,
কাঁদিতেছে রাখালের গৃহগত প্রাণ
মাসির কোলের লাগি। জল শুধু জল
দেখে দেখে চিত্ত তার হয়েছে বিকল।
মসৃণ চিক্কণ কৃষ্ণ কুটিল নিষ্ঠুর,
লোলুপ লেলিহজিহ্ব সর্পসম ক্রূর
খল জল ছল-ভরা, তুলি লক্ষ ফণা
ফুঁসিছে গর্জিছে নিত্য করিছে কামনা
মৃত্তিকার শিশুদের, লালায়িত মুখ।
হে মাটি, হে স্নেহময়ী, অয়ি মৌনমূক,
অয়ি স্থির, অয়ি ধ্রুব, অয়ি পুরাতন,
সর্ব-উপদ্রবসহা আনন্দভবন
শ্যামলকোমলা, যেথা যে-কেহই থাকে
অদৃশ্য দু’ বাহু মেলি টানিছ তাহাকে
অহরহ, অয়ি মুগ্ধে, কী বিপুল টানে
দিগন্তবিস্তৃত তব শান্ত বক্ষ-পানে!

চঞ্চল বালক আসি প্রতি ক্ষণে ক্ষণে
অধীর উৎসুক কণ্ঠে শুধায় ব্রাহ্মণে,
“ঠাকুর, কখন আজি আসিবে জোয়ার?
সহসা স্তিমিত জলে আবেগসঞ্চার
দুই কূল চেতাইল আশার সংবাদে।
ফিরিল তরীর মুখ, মৃদু আর্তনাদে
কাছিতে পড়িল টান, কলশব্দ গীতে
সিন্ধুর বিজয়রথ পশিল নদীতে–
আসিল জোয়ার। মাঝি দেবতারে স্মরি
ত্বরিত উত্তর-মুখে খুলে দিল তরী।
রাখাল শুধায় আসি ব্রাহ্মণের কাছে,
“দেশে পঁহুছিতে আর কত দিন আছে?”

সূর্য অস্ত না যাইতে, ক্রোশ দুই ছেড়ে
উত্তর-বায়ুর বেগ ক্রমে ওঠে বেড়ে।
রূপনারানের মুখে পড়ি বালুচর
সংকীর্ণ নদীর পথে বাধিল সমর
জোয়ারের স্রোতে আর উত্তরমীরে
উত্তাল উদ্দাম। “তরণী ভিড়াও তীরে”
উচ্চকণ্ঠে বারম্বার কহে যাত্রীদল।
কোথা তীর? চারি দিকে ক্ষিপ্তোন্মত্ত জল
আপনার রুদ্রনৃত্যে দেয় করতালি
লক্ষ লক্ষ হাতে। আকাশেরে দেয় গালি
ফেনিল আক্রোশে। এক দিকে যায় দেখা
অতিদূর তীরপ্রান্তে নীল বনরেখা,
অন্য দিকে লুব্ধ ক্ষুব্ধ হিংস্র বারিরাশি
প্রশান্ত সূর্যাস্ত-পানে উঠিছে উচ্ছ্বাসি
উদ্ধতবিদ্রোহভরে। নাহি মানে হাল,
ঘুরে টলমল তরী অশান্ত মাতাল
মূঢ়সম। তীব্র শীতপবনের সনে
মিশিয়া ত্রাসের হিম নরনারীগণে
কাঁপাইছে থরহরি। কেহ হতবাক্,
কেহ বা ক্রন্দন করে ছাড়ে ঊর্ধ্বডাক
ডাকি আত্মজনে। মৈত্র শুষ্ক পাংশুমুখে
চক্ষু মুদি করে জপ। জননীর বুকে
রাখাল লুকায়ে মুখ কাঁপিছে নীরবে।
তখন বিপন্ন মাঝি ডাকি কহে সবে,
“বাবারে দিয়েছে ফাঁকি তোমাদের কেউ–
যা মেনেছে দেয় নাই, তাই এত ঢেউ,
অসময়ে এ তুফান! শুন এই বেলা,
করহ মানত রক্ষা; করিয়ো না খেলা
ক্রুদ্ধ দেবতার সনে।” যার যত ছিল
অর্থ বস্ত্র যাহা-কিছু জলে ফেলি দিল
না করি বিচার। তবু তখনি পলকে
তরীতে উঠিল জল দারুণ ঝলকে।
মাঝি কহে পুনর্বার, “দেবতার ধন
কে যায় ফিরায়ে লয়ে এই বেলা শোন্।”
ব্রাহ্মণ সহসা উঠি কহিলা তখনি
মোক্ষদারে লক্ষ্য করি, “এই সে রমণী
দেবতারে সঁপি দিয়া আপনার ছেলে
চুরি করে নিয়ে যায়।” “দাও তারে ফেলে”
এক বাক্যে গর্জি উঠে তরাসে নিষ্ঠুর
যাত্রী সবে। কহে নারী, “হে দাদাঠাকুর,
রক্ষা করো, রক্ষা করো!” দুই দৃঢ় করে
রাখালেরে প্রাণপণে বক্ষে চাপি ধরে।
র্ভৎসিয়া গর্জিয়া উঠি কহিলা ব্রাহ্মণ,
“আমি তোর রক্ষাকর্তা! রোষে নিশ্চেতন
মা হয়ে আপন পুত্র দিলি দেবতারে,
শেষকালে আমি রক্ষা করিব তাহারে!
শোধ্ দেবতার ঋণ; সত্য ভঙ্গ করে
এতগুলি প্রাণী তুই ডুবাবি সাগরে!”

মোক্ষদা কহিল, “অতি মূর্খ নারী আমি,
কী বলেছি রোষবশে–ওগো অন্তর্যামী,
সেই সত্য হল? সে যে মিথ্যা কতদূর
তখনি শুনে কি তুমি বোঝ নি ঠাকুর?
শুধু কি মুখের বাক্য শুনেছ দেবতা?
শোন নি কি জননীর অন্তরের কথা?”
বলিতে বলিতে যত মিলি মাঝি-দাঁড়ি
বল করি রাখালেরে নিল ছিঁড়ি কাড়ি
মার বক্ষ হতে। মৈত্র মুদি দুই আঁখি
ফিরায়ে রহিল মুখ কানে হাত ঢাকি
দন্তে দন্তে চাপি বলে। কে তারে সহসা
মর্মে মর্মে আঘাতিল বিদ্যুতের কশা,
দংশিল বৃশ্চিকদংশ। “মাসি! মাসি! মাসি!”
বিন্ধিল বহ্নির শলা রুদ্ধ কর্ণে আসি
নিরুপায় অনাথের অন্তিমের ডাক।
চীৎকারি উঠিল বিপ্র, “রাখ্ রাখ্ রাখ্!”
চকিতে হেরিল চাহি মূর্ছি আছে প’ড়ে
মোক্ষদা চরণে তাঁর, মুহূর্তের তরে
ফুটন্ত তরঙ্গমাঝে মেলি আর্ত চোখ
“মাসি” বলি ফুকারিয়া মিলালো বালক
অনন্ততিমিরতলে; শুধু ক্ষীণ মুঠি
বারেক ব্যাকুল বলে ঊর্ধ্ব-পানে উঠি
আকাশে আশ্রয় খুঁজি ডুবিল হতাশে।
“ফিরায়ে আনিব তোরে” কহি ঊর্ধ্বশ্বাসে
ব্রাহ্মণ মুহূর্তমাঝে ঝাঁপ দিল জলে–
আর উঠিল না। সূর্য গেল অস্তাচলে।

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=V5U49KiILao?feature=oembed&w=640&h=360]


কবির মৃত্যুঃ লোরকা স্মরণে

দু’জন খস্‌খসে সবুজ উর্দিপরা সিপাহী
কবিকে নিয়ে গেল টানতে টানতে
কবি প্রশ্ন করলেন : আমার হাতে শিকল বেঁধেছ কেন?
সিপাহী দু’জন উত্তর দিল না;
সিপাহী দু’জনেরই জিভ কাটা।
অস্পষ্ট গোধুলি আলোয় তাদের পায়ে ভারী বুটের শব্দ
তাদের মুখে কঠোর বিষণ্নতা
তাদের চোখে বিজ্ঞাপনের আলোর লাল আভা।
মেটে রঙের রাস্তা চলে গেছে পুকুরের পাড় দিয়ে
ফ্লোরেসেন্ট বাঁশঝাড় ঘুরে—
ফসল কাটা মাঠে এখন
সদ্যকৃত বধ্যভূমি।
সেখানে আরও চারজন সিপাহী রাইফেল হাতে প্রস্তুত
তাদের ঘিরে হাজার হাজার নারী ও পুরুষ
কেউ এসেছে বহু দূরের অড়হর ক্ষেত থেকে পায়ে হেঁটে
কেউ এসেছে পাটকলে ছুটির বাঁশি আগে বাজিয়ে
কেউ এসেছে ঘড়ির দোকানে ঝাঁপ ফেলে
কেউ এসেছে ক্যামেরায় নতুন ফিল্ম ভরে
কেউ এসেছে অন্ধের লাঠি ছুঁয়ে ছুঁয়ে
জননী শিশুকে বাড়িতে রেখে আসেননি
যুবক এনেছে তার যুবতীকে
বৃদ্ধ ধরে আছে বৃদ্ধতরের কাঁধ
সবাই এসেছে একজন কবির
হত্যাদৃশ্য
প্রত্যক্ষ করতে।

খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হলো কবিকে,
তিনি দেখতে লাগলেন
তাঁর ডান হাতের আঙুলগুলো—
কনিষ্ঠায় একটি তিল, অনামিকা অলঙ্কারহীন
মধ্যমায় ঈষৎ টনটনে ব্যথা, তর্জনী সঙ্কেতময়
বৃদ্ধাঙ্গুলি বীভৎস, বিকৃত—
কবি সামান্য হাসলেন,
একজন সিপাহীকে বললেন, আঙুলে
রক্ত জমে যাচ্ছে হে,
হাতের শিকল খুলে দাও!
সহস্র জনতার চিৎকারে সিপাহীর কান
সেই মুহূর্তে বধির হয়ে গেল।

জনতার মধ্য থেখে একজন বৈজ্ঞানিক বললেন একজন কসাইকে,
‘পৃথিবীতে মানুষ যত বাড়ছে, ততই মুর্গী কমে যাচ্ছে।’
একজন আদার ব্যাপারী জাহাজ মার্কা বিড়ি ধরিয়ে বললেন,
‘কাঁচা লঙ্কাতেও আজকাল তেমন ঝাল নেই!’
একজন সংশয়বাদী উচ্চারণ করলেন আপন মনে,
‘বাপের জন্মেও এক সঙ্গে এত বেজম্মা দেখিনি, শালা!’
পরাজিত এম এল এ বললেন একজন ব্যায়ামবীরকে,
‘কুঁচকিতে বড় আমবাত হচ্ছে হে আজকাল!’
একজন ভিখিরি খুচরো পয়সা ভাঙিয়ে দেয়
বাদামওয়ালাকে
একজন পকেটমারের হাত আকস্মাৎ অবশ হয়ে যায়
একজন ঘাটোয়াল বন্যার চিন্তায় আকুল হয়ে পড়ে
একজন প্রধানা শিক্ষয়িত্রী তাঁর ছাত্রীদের জানালেন
‘প্লেটো বলেছিলেন…’
একজন ছাত্র একটি লম্বা লোককে বললো,
‘মাথাটা পকেটে পুরুন দাদা!’
এক নারী অপর নারীকে বললো,
‘এখানে একটা গ্যালারি বানিয়ে দিলে পারতো…’
একজন চাষী একজন জনমজুরকে পরামর্শ দেয়,
‘বৌটার মুখে ফোলিডল ঢেলে দিতে পারো না?’
একজন মানুষ আর একজন মানুষকে বলে,
রক্তপাত ছাড়া পৃথিবী উর্বর হবে না।
তবু একজন সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, এ তো ভুল লোককে
এনেছে। ভুল মানুষ, ভুল মানুষ।

রক্ত গোধূলির পশ্চিমে জ্যোৎস্না, দক্ষিণে মেঘ
বাঁশবনে ডেকে উঠলো বিপন্ন শেয়াল
নারীর অভিমানের মতন পাতলা ছায়া ভাসে
পুকুরের জলে
ঝমঝুমির মতন একটা বকুল গাছের কয়েকশো পাখির ডাক
কবি তাঁর হাতের আঙুল থেকে চোখ তুলে তাকালেন,
জনতার কেন্দ্রবিন্দুতে
রেখা ও অক্ষর থেকে রক্তমাংসের সমাহার
তাঁকে নিয়ে গেল অরণ্যের দিকে
ছেলেবেলার বাতাবি লেবু গাছের সঙ্গে মিশে গেল
হেমন্ত দিনের শেষ আলো
তিনি দেখলেন সেতুর নিচে ঘনায়মান অন্ধকারে
একগুচ্ছ জোনাকি
দমকা হাওয়ায় এলোমেলো হলো চুল, তিনি বুঝতে পারলেন
সমুদ্র থেকে আসছে বৃষ্টিময় মেঘ
তিনি বৃষ্টির জন্য চোখ তুলে আবার
দেখতে পেলেন অরণ্য
অরণ্যের প্রতিটি বৃক্ষের স্বাধীনতা—
গাব গাছ বেয়ে মন্থরভাবে নেমে এলো একটি তক্ষক
ঠিক ঘড়ির মতন সে সাত বার ডাকলো :

সঙ্গে সঙ্গে ছয় রিপুর মতন ছ’জন
বোবা কালা সিপাহী
উঁচিয়ে ধরলো রাইফেল—
যেন মাঝখানে রয়েছে একজন ছেলেধরা
এমনভাবে জনতা রুদ্ধস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো
ইনকিলাব জিন্দাবাদ!
কবির স্বতঃপ্রবৃত্ত ঠোঁট নড়ে উঠলো
তিনি অস্ফুট হৃষ্টতায় বললেন :
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!
মানুষের মুক্তি আসুক!
আমার শিকল খুলে দাও!
কবি অত মানুষের মুখের দিকে চেয়ে খুঁজলেন একটি মানুষ
নারীদের মুখের দিকে চেয়ে খুঁজলেন একটি নারী
তিনি দু’জনকেই পেয়ে গেলেন
কবি আবার তাদের উদ্দেশ্যে মনে মনে বললেন,
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! মিলিত মানুষ ও
প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব বিপ্লব!

প্রথম গুলিটি তাঁর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল—
যেমন যায়,
কবি নিঃশব্দে হাসলেন
দ্বিতীয় গুলিতেই তাঁর বুক ফুটো হয়ে গেল
কবি তবু অপরাজিতের মতন হাসলেন হা-হা শব্দে
তৃতীয় গুলি ভেদ করে গেল তাঁর কণ্ঠ
কবি শান্ত ভাবে বললেন,
আমি মরবো না!
মিথ্যে কথা, কবিরা সব সময় সত্যদ্রষ্টা হয় না।
চতুর্থ গুলিতে বিদীর্ণ হয়ে গেল তাঁর কপাল
পঞ্চম গুলিতে মড় মড় করে উঠলো কাঠের খুঁটি
ষষ্ঠ গুলিতে কবির বুকের ওপর রাখা ডান হাত
ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ে গেল
কবি হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগলেন মাটিতে
জনতা ছুটে এলো কবির রক্ত গায়ে মাথায় মাখতে—
কবি কোনো উল্লাস-ধ্বনি বা হাহাকার কিছুই শুনতে পেলেন না
কবির রক্ত ঘিলু মজ্জা মাটিতে ছিট্‌কে পড়া মাত্রই
আকাশ থেকে বৃষ্টি নামলো দারুণ তোড়ে
শেষে নিশ্বাস পড়ার আগে কবির ঠোঁট একবার
নড়ে উঠলো কি উঠলো না
কেউ সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করেনি।

আসলে, কবির শেষ মুহূর্তটি মোটামুটি আনন্দেই কাটলো
মাটিতে পড়ে থাকা ছিন্ন হাতের দিকে তাকিয়ে তিনি বলতে চাইলেন,
বলেছিলুম কিনা, আমার হাত শিকলে বাঁধা থাকবে না!

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন


লোকেন বোসের জার্নাল

সুজাতাকে ভালোবাসতাম আমি —
এখনো কি ভালোবাসি?
সেটা অবসরে ভাববার কথা,
অবসর তবু নেই;
তবু একদিন হেমন্ত এলে অবকাশ পাওয়া যাবে
এখন শেলফে চার্বাক ফ্রয়েড প্লেটো পাভলভ ভাবে
সুজাতাকে আমি ভালোবাসি কি না।
পুরোনো চিঠির ফাইল কিছু আছে:
সুজাতা লিখেছে আমার কাছে,
বারো তেরো কুড়ি বছর আগের সে-সব কথা;
ফাইল নাড়া কী যে মিহি কেরানীর কাজ;
নাড়বো না আমি
নেড়ে কার কী লাভ;
মনে হয় অমিতা সেনের সাথে সুবলের ভাব,
সুবলেরই শুধু? অবশ্য আমি তাকে
মানে এই — অমিতা বলছি যাকে —
কিন্তু কথাটা থাক;
কিন্তু তবুও —
আজকে হৃদয় পথিক নয়তো আর,
নারী যদি মৃগতৃষ্ণার মতো — তবে
এখন কী করে মন কারভান হবে।

প্রৌঢ় হৃদয়, তুমি
সেই সব মৃগতৃষ্ণিকাতলে ঈষ্সিমুমে
হয়তো কখনো বৈতাল মরুভুমি,
হৃদয়, হৃদয় তুমি!
তারপর তুমি নিজের ভিতরে ফিরে এসে তব চুপে
মরীচিকা জয় করেছো বিনয়ী যে ভীষণ নামরূপে
সেখানে বালির সঙ্গে নিরবতা ধূ ধূ
প্রেম নয় তবু প্রেমেরই মতন শুধু।

অমিতা সেনকে সুবল কি ভালোবাসে?
অমিতা নিজে কি তাকে?
অবসর মতো কথা ভাবা যাবে,
ঢের অবসর চাই;
দূর ব্রহ্মাণ্ডকে তিলে টেনে এনে সমাহিত হওয়া চাই
এখনি টেনিসে যেতে হবে তবু,
ফিরে এসে রাতে ক্লাবে;
কখন সময় হবে।

হেমন্তে ঘাসে নীল ফুল ফোঁটে —
হৃদয় কেন যে কাঁপে,
‘ভালোবাসতাম’ — স্মৃতি — অঙ্গার — পাপে
তর্কিত কেন রয়েছে বর্তমান।
সে-ও কি আমায় — সুজাতা আমায় ভালোবেসে ফেলেছিলো?
আজো ভালোবাসে নাকি?
ইলেকট্রনেরা নিজ দোষগুনে বলয়িত হয়ে রবে;
কোনো অন্তিম ক্ষালিত আকাশে
এর উত্তর হবে?

সুজাতা এখন ভুবনেশ্বরে;
অমিতা কি মিহিজামে?
বহুদিন থেকে ঠিকানা না জেনে ভালোই হয়েছে — সবই।
ঘাসের ভিতরে নীল শাদা ফুল ফোটে হেমন্তরাগে;
সময়ের এই স্থির এক দিক,
তবু স্থিরতর নয়;
প্রতিটি দিনের নতুন জীবাণু আবার স্থাপিত হয়।

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন


হেমন্ত

সবুজ পাতার খামের ভেতর
হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে
কোন্ পাথারের ওপার থেকে
আনল ডেকে হেমন্তকে?
আনল ডেকে মটরশুঁটি,
খেসারি আর কলাই ফুলে
আনল ডেকে কুয়াশাকে
সাঁঝ সকালে নদীর কূলে।
সকাল বেলায় শিশির ভেজা
ঘাসের ওপর চলতে গিয়ে
হাল্কা মধুর শীতের ছোঁয়ায়
শরীর ওঠে শিরশিরিয়ে।
আরও এল সাথে সাথে
নুতন গাছের খেজুর রসে
লোভ দেখিয়ে মিষ্টি পিঠা
মিষ্টি রোদে খেতে বসে।
হেমন্ত তার শিশির ভেজা
আঁচল তলে শিউলি বোঁটায়
চুপে চুপে রং মাখাল
আকাশ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায়।

 

ছোটদের ছড়া

 

শীত


শীতবৃষ্টি

সন্ধ্যা হতে কাঁদছে আকাশ, রিনরিন
স্মৃতিরা ভিজছে তোমাকে নিয়ে
ইউরোপ বড়ো ম্লেচ্ছ, ঋতুজ্ঞানহীন
শীত আসে ছাতা মাথায় দিয়ে

শীতবৃষ্টি, শীতবৃষ্টি, পাহাড় কাঁপাকাঁপি
ব্যালকনিতে পাখিদের জল-চুমো
একলা ঘরে হিটারের জ্বর মাপি
মিস করছি তোমার গায়ের ওমও

বিজন ট্রেনে কয়েকজোড়া ভিজে ভালোবাসা
ঠাণ্ডা আলোয় ঠোঁট — সেতুতে উঠেছে ধোঁয়াশা
ওদের জন্যই শীতের বৃষ্টি। জলও নিরব প্রেমি
ঠোঁটের আগুনে প্রেমের যজ্ঞ। জ্বলছি নাকি আমি?

তুমিও রয়েছ বাংলাদেশে, ভাদ্র মাসের ভাপে
জানলে না তো, বৃষ্টি হয়ে ঝরছো ইউরোপে

 

– সুজন দেবনাথ, শীতের কবিতা

প্রার্থী

হে সূর্য! শীতের সূর্য!
হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়
আমরা থাকি,
যেমন প্রতীক্ষা ক’রে থাকে কৃষকদের চঞ্চল চোখ,
ধানকাটার রোমাঞ্চকর দিনগুলির জন্যে।

হে সূর্য, তুমি তো জানো,
আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব!
সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে,
এক-টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে,
কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই!

সকালের এক-টুকরো রোদ্দুর
এক টুকরো সোনার চেয়েও মনে হয় দামী।
ঘর ছেড়ে আমরা এদিক ওদিকে যাই
এক-টুকরো রোদ্দুরের তৃষ্ণায়।

হে সুর্য!
তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে
উত্তাপ আর আলো দিও,
আর উত্তাপ দিও,
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।

হে সূর্য
তুমি আমাদের উত্তাপ দিও
শুনেছি, তুমি এক জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ড,
তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে
একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকেই এক একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডে
পরিণত হব!
তারপর সেই উত্তাপে যখন পুড়বে আমাদের জড়তা,
তখন হয়তো গরম কাপড়ে ঢেকে দিতে পারবো
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।
আজ কিন্তু আমরা তোমার অকৃপণ উত্তাপের প্রার্থী।।

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=sTEJISdRovs?feature=oembed&w=640&h=360]

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন

– সুকান্ত ভট্টাচার্য, আবৃত্তি, উৎসাহের কবিতা, দেশাত্মবোধক কবিতা, দ্রোহের কবিতা, প্রার্থনামূলক কবিতা, মানবতাবাদী কবিতা, শীতের কবিতা

বসন্ত


বসন্ত নয়, অবহেলা

বসন্ত নয়, আমার দরজায় প্রথম কড়া নেড়েছিল অবহেলা।
ভেবেছিলাম অনেকগুলো বর্ষা শেষে শরতের উষ্ণতা মিশিয়ে এলো বুঝি বসন্ত!
দরজা খুলে দেখি আমাকে ভালোবেসে এসেছে অবহেলা।
মধ্য দুপুরে তীর্যক রোদের মত অনেকটা নির্লজ্জের মত আমাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত অবহেলা।
আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখেছিলাম আমার দীন দশায় কারো করুণা বা আর্তির পেখম ছড়িয়ে আছে কিনা!
ছিলো না।
বৃষ্টিহীন জনপদে খড়খড়ে রোদ যেমন দস্যুর মত অদমনীয়
তেমনি অবহেলাও আমাকে আগলে রেখেছিল নির্মোহ নিঃসঙ্কোচিত।

আমি অবহেলাকে পিছনে ফেলে একবার ভো-দৌড় দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম।
তখন দেখি আমার সামনে কলহাস্যে দাঁড়িয়েছে উপেক্ষা।

উপেক্ষার সঙ্গেও একবার কানামাছি খেলে এগিয়ে গিয়েছিলাম তোমাদের কোলাহলমুখর আনন্দসভায়।
কী মিলেছিলো?
ঠোঁট উল্টানো ভর্ৎসনা আর অভিশপ্ত অনূঢ়ার মত একতাল অবজ্ঞা।
তাও স’য়ে গিয়েছিলাম একটা সময়।

ধরেই নিয়েছিলাম আমার কোনো কালেই হবে না রাবীন্দ্রিক প্রেম
তোমাদের জয়গানে করতালিতে নতজানু থেকেছিলো আমার চাপা আক্ষেপ, লজ্জা
বুঝে গিয়েছিলাম জীবনানন্দময় স্বপ্ন আমাকে ছোঁবে না
জয়নুলের রঙ নিয়ে কল্পনার বেসাতি
হারানো দিনের গানের ঐন্দ্রালিক তন্ময়তা
বা ফুল, পাখি, নদীর কাব্যালাপে কারা মশগুল হলো, এ নিয়ে কৌতূহল দেখাবার দুঃসাহস আমি দেখাইনি কখনো
এত কিছু নেই জেনেও নজরুলের মতো বিদ্রোহী হবো, সেই অমিত শক্তিও আমার ছিলো না
মেনে নেয়ার বিনয়টুকু ছাড়া আসলে আমার কিছুই ছিলো না
শুধু ছিলো অবহেলা, উপেক্ষা আর অবজ্ঞা।

হ্যাঁ একবার তুমি বা তোমরা যেন দয়া করে বাঁকা চোখে তাকিয়েছিলে আমার দিকে।
তাচ্ছিল্য নয় একটু মায়াই যেন ছিল,
হতে পারে কাঁপা আবেগ ও মিশ্রিত ছিল তোমার দৃষ্টিতে।
ওইটুকুই আমার যা পাওয়া।

আমি ঝরে যাওয়া পাতা,
তুমি ছিলে আকস্মিক দমকা হাওয়া।
তারপরও অবহেলার চাদর ছাড়িয়ে উপেক্ষার দেয়াল ডিঙিয়ে ও অবহেলার লাল দাগ মুছে জীবনের কোনো সীমারেখা ভাঙতে পারিনি আমি।
একথা জানে শুধু অন্তর্যামী।

অনেক স্বপ্নপ্রবণ হয়ে একবার ভেবেছিলাম
এই অবহেলা তুষারপাতের মুখচ্ছবি, উপেক্ষা কাঁচের দেওয়াল, অবজ্ঞা কুচকুচে অন্ধকার
এর কিছুই থাকবে না একটি বসন্তের ফুঁৎকারে
একটি ঝলমলে পোশাক গায়ে চড়িয়ে হাতের মুঠোয় বসন্ত নিয়ে অন্তত একটি সন্ধ্যাকে উজ্জ্বল করে নেবো
এমন ভাবাবেগও ছিলো আকাশের কার্নিশে লেপ্টে থাকা পেঁজা মেঘের মতো
ঐ মেঘ কখনো বৃষ্টি হয়ে নামেনি
তোমার বা তোমাদের নাগরিক কোলাহল কখনো থামেনি
অর্ধেক জীবন ফেলে এসে দেখি অনেক কিছু বদলে গেছে
সেকি!
কোথায় হারালো কৈশোরের দিনলিপি বিপন্ন করা অবহেলা
স্বপ্নকে অবদমনের স্বরলিপিতে আটকে ফেলা উপেক্ষা
আর তারুণ্যকে ম্রিয়মাণ করে রাখার অবজ্ঞা
ওরা আমাকে চোখ রাঙাতে পারে না ঠিক, তবে এখনো পোড় খাওয়া দিন বড্ড রঙিন
আমি আজ সমুদ্র জলে হাত রেখে বলে দিতে পারি
কোন ঢেউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তোমাদের গোপন অশ্রুকণা
আকাশ পানে তাকিয়ে বুঝতে পারি কার দীর্ঘশ্বাসে ঝড়ে পড়ছে নক্ষত্র
এমনকি তুমি যে সম্রাজ্ঞীর বেশের আড়ালের মিহিন কষ্ট চেপে হয়েছো লাবণ্যময় পাষাণ, পাথর
এটাও দেখতে পাই অন্তরদৃষ্টি দিয়ে
আমি জানি, দীর্ঘশ্বাসে ভরা এ আখ্যান যদি পেতো কবিতার রূপ
সেই অবহেলা হতো বসন্ত স্বরূপ।

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=jg27E39ATiU?feature=oembed&w=640&h=360]

বসন্তের কবিতাসমূহ

– দর্পন কবির, আবৃত্তি, নিঃসঙ্গতার কবিতা, প্রকৃতির কবিতা, প্রেমের কবিতা, বসন্তের কবিতা, বিরহের কবিতা

ফাগুন রঙের ইশারা

লাল আগুনের পলাশ শিমুল কৃষ্ণচূড়ায়—
ফাগুন রঙের লাল ইশারায়;
আহা, তার ডাক শোনা যায়— রূপেলা গান কোকিলায়!

ফাগুনের মধুর ঘ্রাণে—
দুপুরে আমের বনে—
আমি তো মত্ত মুগ্ধ এই নিরালায়…

 

– কামাল বারি, বসন্তের কবিতা

ফাগুন এলেই

ফাগুন এলেই একটি পাখি ডাকে
থেকে থেকেই ডাকে
তাকে তোমরা কোকিল বলবে? বলো।
আমি যে তার নাম রেখেছি আশা
নাম দিয়েছি ভাষা,
কতো নামেই ‘তাকে’ ডাকি
মেটে না পিপাসা।
ফাগুন আনে ফুলের তোড়া
কখন প্রতিবাদ,
ফাগুন যেন পাগলা ঘোড়া
মানতে চায় না বাঁধ।

ফাগুন এলেই অলি এসে জোটে
কলিরা পা’য় লোটে,
তাকে তোমরা শহীদ মিনার বলো !
আমি যে তার নাম রেখেছি ফেরা
নিজের ঘরে ফেরা,
ঘর থেকে যে পথে ওড়ে
তেমন বিহঙ্গেরা।

ফাগুন যেন ফুফুর আরশি
দেখি নিজের মুখ,
ফাগুন শেখায় ‘শুধরে লও হে
জীবনের ভুল-চুক।’

ফাগুন এলেই একটি পাখি শাখে
থেকে থেকেই ডাকে।
কোকিল বলবে তাকে? বলো।
ফাগুন এলেই অলি এসে জোটে
কলিরা পা’য় লোটে
বলবে তাকে শহীদ মিনার? বলো।

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=xoaeLCA93qw?feature=oembed&w=640&h=360]

– আসাদ চৌধুরী, আবৃত্তি, একুশের কবিতা, বসন্তের কবিতা

ফুল ফুটুক না ফুটুক

ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।

শান-বাঁধানো ফুটপাথে
পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ
কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে
হাসছে।

ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।

আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে
তারপর খুলে –
মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে
তারপর তুলে –
যে দিনগুলো রাস্তা দিয়ে চলে গেছে
যেন না ফেরে।

গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে
একটা দুটো পয়সা পেলে
যে হরবোলা ছেলেটা
কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত
– তাকে ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো।

লাল কালিতে ছাপা হলদে চিঠির মত
আকাশটাকে মাথায় নিয়ে
এ-গলির এক কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে
রেলিঙে বুক চেপে ধ’রে
এই সব সাত-পাঁচ ভাবছিল –

ঠিক সেই সময়
চোখের মাথা খেয়ে গায়ে উড়ে এসে বসল
আ মরণ! পোড়ারমুখ লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি!

তারপর দাড়ম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ।
অন্ধকারে মুখ চাপা দিয়ে
দড়িপাকানো সেই গাছ
তখন ও হাসছে।

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=R6WaBZ0e4K8?feature=oembed&w=640&h=360]

– সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বসন্তের কবিতা

তাহারেই পড়ে মনে

“হে কবি! নীরব কেন-ফাল্গুন যে এসেছে ধরায়,
বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?”
কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি-
“দখিন দুয়ার গেছে খুলি?
বাতাবী নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল?
দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?”
“এখনো দেখনি তুমি?” কহিলাম “কেন কবি আজ
এমন উন্মনা তুমি? কোথা তব নব পুষ্পসাজ?”
কহিল সে সুদূরে চাহিয়া-
“অলখের পাথার বাহিয়া
তরী তার এসেছে কি? বেজেছে কি আগমনী গান?
ডেকেছে কি সে আমারে? -শুনি নাই, রাখিনি সন্ধান।”
কহিলাম “ওগো কবি, রচিয়া লহ না আজও গীতি,
বসন্ত-বন্দনা তব কণ্ঠে শুনি-এ মোর মিনতি।”
কহিল সে মৃদু মধুস্বরে-
“নাই হ’ল, না হোক এবারে-
আমার গাহিতে গান! বসন্তরে আনিতে ধরিয়া-
রহেনি, সে ভুলেনি তো, এসেছে তো ফাল্গুন স্মরিয়া।”
কহিলাম “ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই?
যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।”
কহিল সে পরম হেলায়-
“বৃথা কেন? ফাগুন বেলায়
ফুল কি ফোটে নি শাখে? পুষ্পারতি লভে নি কি ঋতুর রাজন?
মাধবী কুঁড়ির বুকে গন্ধ নাহি? করে নি সে অর্ঘ্য বিরচন?”
“হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?”
কহিলাম “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?”
কহিল সে কাছে সরি আসি-
“কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী-
গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে। তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোনমতে।”

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=KsrhtU5f3JU?feature=oembed&w=640&h=360]


– সুফিয়া কামাল, নিঃসঙ্গতার কবিতা, প্রেমের কবিতা, বসন্তের কবিতা, বিরহের কবিতা, রূপক কবিতা, শোকের কবিতা

ফাল্গুন

ফাল্গুনে বিকশিত
____ কাঞ্চন ফুল,
ডালে ডালে পুঞ্জিত
____ আম্রমুকুল।
চঞ্চল মৌমাছি
____ গুঞ্জরি গায়,
বেণুবনে মর্মরে
____ দক্ষিণবায়।

স্পন্দিত নদীজল
____ ঝিলিমিলি করে,
জ্যোৎস্নার ঝিকিমিকি
____ বালুকার চরে।
নৌকা ডাঙায় বাঁধা,
____ কাণ্ডারী জাগে,
পূর্ণিমারাত্রির
____ মত্ততা লাগে।

খেয়াঘাটে ওঠে গান
____ অশ্বথতলে,
পান্থ বাজায়ে বাঁশি
____ আনমনে চলে।
ধায় সে বংশীরব
____ বহুদূর গাঁয়,
জনহীন প্রান্তর
____ পার হয়ে যায়।

দূরে কোন্ শয্যায়
____ একা কোন্ ছেলে
বংশীর ধ্বনি শুনে
____ ভাবে চোখ মেলে —
যেন কোন্ যাত্রী সে,
____ রাত্রি অগাধ,
জ্যোৎস্নাসমুদ্রের
____ তরী যেন চাঁদ।

চলে যায় চাঁদে চ’ড়ে
____ সারা রাত ধরি,
মেঘেদের ঘাটে ঘাটে
____ ছুঁয়ে যায় তরী।
রাত কাটে, ভোর হয়,
____ পাখি জাগে বনে —
চাঁদের তরণী ঠেকে
____ ধরণীর কোণে।

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=Q-iRfvj4NW0?feature=oembed&w=640&h=360]

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আবৃত্তি, উৎসাহের কবিতা, প্রকৃতির কবিতা, বসন্তের কবিতা

গ্রীষ্ম


বাংলাদেশ

নমঃ নমঃ নমঃ                বাঙলা দেশ মম
চির-মনোরম                    চির-মধুর।
বুকে নিরবধি                    বহে শত নদী
চরণে জলধির                  বাজে নূপুর॥

শিয়রে গিরি-রাজ             হিমালয় প্রহরী

আশিস্-মেঘবারি              সদা তার পড়ে ঝরি,
যেন উমার চেয়ে              এ আদরিনী মেয়ে.
ওড়ে আকাশ ছেয়ে          মেঘ চিকুর ॥

গ্রীষ্মে নাচে বামা               কাল-বোশেখী ঝড়ে,
সহসা বরষাতে                 কাঁদিয়া ভেঙে পড়ে,
শরতে হেসে চলে             শেফালিকা-তলে
গাহিয়া আগমনী               গীতি বিধুর॥

হরিত অঞ্চল                     হেমন্তে দুলায়ে
ফেরে সে মাঠে মাঠে       শিশির-ভেজা পায়ে,
শীতের অলস বেলা          পাতা ঝরার খেলা
ফাগুনে পরে                    সাজ ফুল-বধূর॥

এই দেশের মাটি               জল ও ফুলে ফলে
যে রস যে সুধা                  নাহি ভূমণ্ডলে,
এই মায়ের বুকে               হেসে খেলে সুখে
ঘুমাব এই বুকে                 স্বপ্নাতুর॥

– কাজী নজরুল ইসলাম, গ্রীষ্মের কবিতা

পরানের গহীন ভিতর ১৬

যমুনার পরে আসলে তার কথা খালি মনে হয়,
এমন পরান পড়ে- সব কিছু বিকাল-বিকাল,
লোকের চোহারা দেখি, হাত নাড়ে, নাড়ে তারা পাও,
কথা কয়, তাও বোঝা যায় না যে কী কয় কী কয়।
চক্ষের ভিতরে নাচে হাটবারে বাঁওহাতি খাল,
নায়ের উপরে দাগ- একদিন রাখছিল পাও।
জলে ভেজা, কত বর্ষা গ্রীষ্মকাল গ্যাছে তারপর,
কতবার নাও নিয়া পাড়ি দিছি এ কূল ও কুল,
তাও সেই পাড় আমি চিনি নাই, দেখি নাই গাঙ্গে।
বুকের ভিতরে ঢেলা সারাদিন কিষানেরা ভাঙ্গে,
রাখাল নষ্টামি করে, পাড়ে লাল শিমুলের ফুল,
জলের ভিতরে নড়ে মনে বান্ধা আছিল যে ঘরে।
কইছিল সে আমারে- সেই পাড়ে নিবা না আমারে?
কোন পাড়? ইচ্ছা তার আছিল সে যায় কোন পাড়ে?

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=EiTkWRmtd3o?feature=oembed&w=640&h=360]

 


প্রেমের কবিতাসমূহ

 

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন

– সৈয়দ শামসুল হক, আবৃত্তি, কাব্যগ্রন্থ: পরানের গহীন ভিতর, গ্রীষ্মের কবিতা, প্রেমের কবিতা

পরানের গহীন ভিতর ২৫

কত না দুধের ক্ষীর খায়া গ্যাছে কালের গোপাল,
কতবার কত রোয়া কারবালা খ্যাতের খরায়,
কন না রঙিলা নাও নিয়া গ্যাছে কাল যমুনায়,
অঘোরে হারায়া গাভি ফেরে নাই নিজস্ব রাখাল।
কত না পুকুর দিতে পারে নাই পানি গ্রীষ্মকালে,
বাসকের ছাল কত ভালো করতে পারে নাই রোগ,
দেহের কত না রক্ত খায়া গ্যাছে কত ছিনাজোঁক,
কুসুম উধাও হয়া গ্যাছে কত শিমুলের ডালে।
তাই কি ছাড়ান দিমু বিহানের ধবল দোহান?
কামারের কাছে বান্ধা দিমু এই রূপার লাঙ্গল?
আমার বৃক্ষেরে তাই দিতে কমু জহরের ফল?
বাদ দিয়া দিমু কও পরানের গহীন কথন?
আমার তিস্তারে দেখি, সেও পোষ মানে না ভাটিতে,
কী তার উথাল নাচ গেরস্তের সমান মাটিতে!

 

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন

– সৈয়দ শামসুল হক, কাব্যগ্রন্থ: পরানের গহীন ভিতর, গ্রীষ্মের কবিতা

বর্ষা


যখন বৃষ্টি নামলো

বুকের মধ্যে বৃষ্টি নামে, নৌকা টলোমলো
কূল ছেড়ে আজ অকূলে যাই এমনও সম্বল
নেই নিকটে – হয়তো ছিলো বৃষ্টি আসার আগে
চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি, তাই কি মনে জাগে
পোড়োবাড়ির স্মৃতি? আমার স্বপ্নে-মেশা দিনও?
চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি, চলচ্ছক্তিহীন।

বৃষ্টি নামলো যখন আমি উঠোন-পানে একা
দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাবো দেখা
হয়তো মেঘে-বৃষ্টিতে বা শিউলিগাছের তলে
আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ-ছেঁচা জলে
কিন্তু তুমি নেই বাহিরে- অন্তরে মেঘ করে
ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে!

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=qPkiHssgPsM?feature=oembed&w=640&h=360]



বৃষ্টি চিহ্নিত ভালবাসা

মনে আছে একবার বৃষ্টি নেমেছিলো?

একবার ডাউন ট্রেনের মত বৃষ্টি এসে থেমেছিল
আমাদের ইষ্টিশানে সারাদিন জল ডাকাতের মতো
উৎপাত শুরু করে দিয়েছিল তারা,
ছোটখাটো রাজনীতিকের মত পাড়ায় পাড়ায়
জুড়ে দিয়েছিল অথই স্লোগান।

তবু কেউ আমাদের কাদা ভেঙে যায়নি মিটিংয়ে
থিয়েটার পণ্ড হলো, এ বৃষ্টিতে সভা আর
তাসের আড্ডার লোক ফিরে এলো ঘরে ;
ব্যবসার হলো ক্ষতি, দারুণ দুর্দশা,

সারাদিন অমুক নিপাত যাক, অমুক জিন্দাবাদ
অমুকের ধ্বংস চাই বলে আর হাবিজাবি হলো না পাড়াটা।

ভদ্র শান্ত কেবল কয়েকটি গাছ বেফাঁস নারীর মত
চুল ঝাড়লো আঙিনায় হঠাত বাতাসে আর
পাশের বাড়িতে কোনো হারমোনিয়ামে শুধু উঠতি এক আগ্রহী গায়িকা
স্বরচিত মেঘমালা গাইলো তিনবার !

আর ক’টি চা’খোর মানুষ এলো
রেনকোট গায়ে চেপে চায়ের দোকানে ;
তাদের স্বভাবসিদ্ধ গলা থেকে শোনা গেল:
কী করি বলুন দেখি, দাঁত পড়ে যাচ্ছে, তবু মাইনেটা বাড়ছে না,
ডাক্তারের কাছে যাই তবু শুধু বাড়ছেই ক্রমাগত বাড়ছেই
হৃদরোগ, চোখের অসুখ !

একজন বেরসিক তার মধ্যে বলে উঠলো:
বৃষ্টি মানে বুঝলেন তো, অযথাই যানবাহন পয়সা খরচ !

একজন বাতের রোগী গলা কাশলো:
ওহে ছোকরা, নুন চায়ে লেবুর টুকরোটা একটু বড়ো করে দিও।

তাদের বিভিন্ন সব জীবনের খুটিনাটি দুঃখবোধ সমস্যায় তবু
সেদিন বৃষ্টিতে কিছু আসে যায়নি আমাদের
কেননা সেদিন সারাদিন বৃষ্টি পড়েছিলো,
সারাদিন আকাশের অন্ধকার বর্ষণের সানুনয় অনুরোধে
আমাদের পাশাপাশি শুয়ে থাকতে হয়েছিলো সারাদিন

আমাদের হৃদয়ে অক্ষরভরা উপন্যাস পড়তে হয়েছিলো।



প্রেমের কবিতাসমূহ

 

 

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন


বর্ষা বৃষ্টি কিংবা ভালোবাসার কবিতা

এই একখণ্ড সাদা কাগজের উপর মেঘ এসে যখন দাঁড়ায়
তখন প্রতিটি অক্ষর হয়ে ওঠে একেকটি বৃষ্টির ফোঁটা,
শব্দগুলি বর্ষাকাল
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি বিন্দু বিন্দু অশ্রুর কবিতা।
মেঘ ভাঙতে ভাঙতে দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে
উত্তর গোলার্ধে যায়।
সাদা কাগজের উপর পড়ে থাকে স্মৃতি,
ভালোবাসার গন্ধ
আমি হাত বাড়িয়ে সেই মেঘবৃষ্টির স্বর্ণমুদ্রা কুড়াতে থাকি,
এই শাদা কাগজ মূহুর্তে হয়ে ওঠে বিরহী মেঘদূত
অথই গীতবিতান।
কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ প্রেমের কবিতা
লিখে রেখেছে আকাশে
সেই ভালোবাসার কবিতা এই বৃষ্টি,
এই ভরা বর্ষা।

আপনি যদি কবিতার আকাশে লিখতে চান তাহলে রেজিস্ট্রেশন করুন


জীবনমুদ্রা

যে ভাবেই দেখো- জীবন এক প্ররোচনাময় টগবগ, কতিপয় ঘোরেই সুস্থির! বরং অননুমোদিত সেইসব দিনের কথা ভেবে হেঁটে যাও প্রাগ্রসর পথে, হয়তো শুনতে পাবে- পর্যটনপ্রিয় ঘোড়াদের হ্রেষাধ্বনি মিলিয়ে যাচ্ছে শ্রাবণভূমির অচেনা সন্ধ্যায়, বুঝে নিও- অশ্রু ও বর্ষার শাশ্বতরূপে প্রোথিত রয়েছে রূপান্তরের বিপুল সম্ভার। কিংবা, ঊরুস্তম্ভে উল্কি এঁকে বিকল্প উৎসেও খুঁজে পেতে পারো জীবনের প্রকৃত নৈর্ঋত!

এভাবেই- হাঁটতে হাঁটতে ভেঙে ফেলো অক্ষরের শব আর কাচের মহিমা; প্ররোচনা এড়িয়ে- ভাবে ও আচারে পুনরাধুনিক হয়ে ওঠাই বরং শ্রেয়তর!

 


অনুভূতির ভাঙা মাইক

কতটা জলে নামলে কাপড় ভেজে
না জেনেই যিনি বস্ত্রমন্ত্রী,
তিনি ডাইনিং টেবিলে বসে
মৃত মাছের শরীরে ঢালছেন
বিচ্ছিন্ন ঘটনার পারফিউম।
এই দিনকানা নগরের
ইস্যুবাদীরা জানিয়ে দিল-
জলে নামা লোকটির শরীরে
আদতে কাপড়ই ছিল না।
নদীভক্তরা নগ্নতার অভিযোগে
চৌকাঠ মাড়াতেই
দুলতে থাকে অনুভূতির এ্যান্টেনা।
সহসা সার্কাস ঠেলে ট্রাম্প করে বসে
এক প্রশ্নবোধক তর্জ্জনী-
শত বছরে কত নদী ধর্ষিত হল
কার দায়ে কত নদী অকালে মরে গেল
সে উত্তর দেবে কি মহামান্য হাইকোর্ট?
নদীও সংগুপ্ত খেয়ালে ভেঙেছিল কত ঘর
সে খবর জানা যাবে
অশীতিপরার ছিপি খুলে
সেই সব গল্প
ফেরি করে বেড়ায় ঘুমপাড়ানিরা
সেই ঘরগুলো কি বাঁধা হয়েছিল সব?

তুমি যে বৃষ্টি ভালোবাসো

আমিও ভুলে যাব সব
আকর্ষিত আঁশটে গন্ধ,
রিকশার হুডে আছড়ে পড়া তপ্ত দুপুর,
তোমার ঠোঁটের নামহীন স্বাদ
আর পাশের গলির হ্যাংলা কুকুরটাকেও।
তুমিও জানো
এত রাতে দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রতিটি রাস্তার গেটে ঝুলছে
প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত সাইনবোর্ড।
খরিদ্দারের অপেক্ষায় মেকাপে লজ্জা ঢেকে
এখনো দাঁড়িয়ে আছে দু-একজন বেশ্যা।
এছাড়া কোথাও নেই কেউ।
শুধু আমি ছুটছি বৃষ্টি কাঁধে
তোমার কাছে।
তুমি যে বড্ড বৃষ্টি ভালোবাসো।

পোকাগ্রস্ত প্রাণ

নিম্নগামী ঋতুর ভেতর সময়কে ধাবিত করছে ঘোরগ্রস্ত পোকা। সভ্যতার অতীত দাবানল পোড়াতে পোড়াতে এখন সে মানুষবাহী। অযুত বরষ পূর্বে বোকা বনে গেছে এইসব প্রাণ। মোহ আর মায়ায় ডুবে থাকে বলে শূন্যযোগ ঘটে না। জলের সাথে প্রাণগুলোর চলে অবুঝ প্রণয়। জলও কোনো কোনো মায়ার সমষ্টি আধার।
তুমি অন্ধকার নিয়ে খেলা করো! এসো আমরা ঋতু তৈরি করি। একটা সফল ঋতু সময়কে স্থির করে দিতে পারে।

ছায়ানাট

চার্বাক খোলো, জলপর্বে এসে ভাসুক অপ্সরা।
কেউ তো তুমি, চিৎকার শেষে যে বাজাতে পারে পাতার বাঁশি।
সোমবারের মতো হে হিব্রু ময়ূর, তোমার পেখম ছুঁয়ে নেচে উঠুক অক্ষরমালা।
আমারও মুদ্রাদোষ আছে, অকস্মাৎ বেজে উঠি সংসারের মতো…
একদল ব্রহ্মনারী কী নিশ্চুপ শুয়ে আছে ঘাসে; তারা ডাক দিলে চাঁদের কপাট খুলে
নেমে আসে চাঁদ।
তুমি তার কসমিক মায়া, একবার পিপাসা বিলাও।

মেঘের ইতিকথা

অনেকদিন তোমার প্রতীক্ষায় আছি,
চাতকের মতো পথ পানে চেয়ে,
মুক্তির আশায়।
আচ্ছা তোমার মনে আছে,
আমাদের ছোট ছোট স্বপ্ন গুঁটি গুঁটি পায়ে,
গোলাপের নেশাতুর নির্যাস মেখে
নিয়ন আলোয় মোড়া রাজপথে
হেঁটেছে বহুদূর অবিশ্রান্তভাবে,
পৃথিবীর পথে পথে।
লজ্জামাখা চোখ, পদ্মফোটা হাসি
আমি এখনো খুঁজে বেড়াই আমার পৃথিবীতে।
মনে আছে, তুমি যখন আমায় দুঃখ দিতে,
মেঘমল্লার সিংহনাদে আছড়ে পড়ত পৃথিবীতে।
অবশ্য সেজন্য তুমি আমাকে ডাকতে ‘মেঘ’ বলে।
আর আমি তোমার নাম দিয়েছিলাম ‘বিজলি’
মেঘের মধ্যে বিজলি আলো ফুটিয়ে হাসে।
এখন মেঘ তার নিজের আকাশেই ওড়ে,
খুঁজে বেড়ায় তার বিজলিকে।
বাতিকগ্রস্ত জীবনের নিভে যাওয়া বাতিঘরকে কেন্দ্র করে
বয়ে যায় সময়, বয়ে যায় মেঘ।
হয়তো এটাই মেঘের ইতিকথা।

জলকীর্তন

মূর্ধন্য সূর্যের তেজ আমাকে বারবার জলের কাছে নিয়ে যায়। পিপাসার শরীরে লোনা ধরে। জোয়ারের আশায় মন মাতায়, ঝাপায় দুনিয়ার প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। নদী নারী মৃত্তিকা জলকীর্তন করে। পিাসা কাতর শঙ্খচিল মেঘেদের বর্ষার গান শোনায়। আদিম পৃথিবী থেকে জলের স্তর নেমে গেছে সীমা থেকে শীলায়। প্রকৃতির বৈরিতায়- বিপ্রলব্ধে মধুমতি, পদ্মা বিহনে কুমার। কালের মৃত্যু ঘটে, ঘন হয়ে আসে মহাকাল। জলমঙ্গলের আশায়-উদাসী বেহুলা আসন পাতে অর্বাক বৃক্ষের তলায়। বৃক্ষ সবই দেখে, মৃত্যু হাসে আবার নদী হয়ে যায়।

Error: View 8fcb561ub0 may not exist
Error: View 01c86edz38 may not exist

Loading